সিডর ও আইলার বিরুদ্ধে রীট

ভূমিকা

 
বৈশ্বিক উষ্ণায়নে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে প্রাকৃতিক দুই দানব সিডর আর আইলা সুন্দরবনসহ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকুল অঞ্চলে সর্বজীব ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর মর্মান্তিক আঘাত হানে। ২০০৭-এর নভেম্বরের ১৫ তারিখে সিডরের আঘাতে ধরাশায়ী প্রকৃতি, মানুষ আর সুন্দরবনের পশুপাখী কেবলমাত্র লাঠিভর দিয়ে দাঁড়াতে শুরু করছিল ঠিক সেই সময় ২০০৯-এর মে মাসে আইলার আচমকা আক্রমণে প্রবাহিত প্লাবনে সুন্দরবনসহ সংলগ্ন দশ-বারটি উপকূলীয় জেলার বিস্তীর্ণ নিম্ন অঞ্চল তলিয়ে যায়। এর মধ্যে পূর্বাঞ্চলীয় জেলাগুলোর প্লাবিত জনপদ ক্রমশ নিষ্কৃতি পেতে থাকলেও সুন্দরবনের দক্ষিণ ও পশ্চিম রেঞ্জ এবং তদসংলগ্ন উপকণ্ঠ বিশেষ করে খুলনা জেলার দাকোপ, কয়রা এবং সাতক্ষীরার শ্যামনগর আর আশাশুনির বেশ কয়েকটি ইউনিয়ন থৈ থৈ লবণাক্ত পানিতে জলমগ্ন হয়ে পড়ে। নিদারুণ মানবিক বিপর্যয়ের শিকার হয় এসব এলাকার মানুষ আর সুন্দরবনের পশুপাখিরাও। ২০০৭ সালে সিডর আর ২০০৯ সালে আইলা দেশের দক্ষিণ পশ্চিাঞ্চলের অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে দেয়। ২০০৭ সালে দেশের উত্তর, পূর্ব ও উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে পর পর দুটি বন্যা গোটা দেশের ৬৫% এলাকায় খাদ্য শষ্য উৎপাদনে ব্যাপক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে, দেশের অবশিষ্ট ৩৫% ভাগ এলাকায়, আমন ধানের অতি সম্ভাবনাময় উৎপাদন স্থলে ফসল ঘরে তোলার অতি প্রান্তিক পর্যায়ে সিডরের পরিকল্পিত আক্রমনে সে বছরে গোটা অর্থনীতিকেই খাদ্য ঘাটতির ঝুঁকিতে নিক্ষেপ করে। 
 
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ শিকার এই জনপদের জীববৈচিত্র্যে যে সমস্ত পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয় তা কোপেনহেগেনের বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে, ইউরোপীয় পার্লামেন্টের বিশেষ অধিবেশনে আলোচনায় উদ্বেগের সাথে উঠে আসে। উপলব্ধির আলোয় আমি সুন্দরবনের সকল পশু ও জীবজন্তুর অন্তর্লোকের বিমূর্ত সুর মূর্চ্ছনাকে মূর্ত করে তোলার প্রয়াস পেয়েছি। জলবায়ুর পরিবর্তন প্রেক্ষাপটে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যে যে পরিবর্তনের হাওয়া বইছে তাতে সুন্দরবন সন্নিকটবর্তী এলাকার মানুষদের জীবনযাপন প্রক্রিয়ায় যে পরিবর্তনের সূচনা, সেখানে মানবভাগ্যের যে বিপর্যয় প্রতিভাত হচ্ছে তাকে সাঙ্কেতিক রেখায় ফুটিয়ে তুলতেই এ লেখা। আধুনিক রচনারীতিতে বাস্তবতার সাথে ভাব কল্পনার মিশেল দিতে যেয়ে স্বপ্ন ও হেয়ালীর আশ্রয় নেয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। প্রাচীন পুঁথি সাহিত্যে পাওয়া যায় যে সেখানে সুন্দরবনের জীবজন্তু ও বনে আনাগোনাকারীদের মধ্যে সহজ যোগাযোগ বাস্তবতায় বাঙ্গময় হয়ে নানান সূত্রে সংকীর্তিত হত। সব চাইতে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল সুন্দরবনের পশুপাখি জীবজন্তু নিচয়ের সাথে সুন্দরবনের উপকণ্ঠে বসবাসকারী মানুষদের মধ্যে সহযোগিতা সহমর্র্মিতার দর্শন সব সময় বেগবান ছিল, আপাত দৃষ্টিতে বনের বাঘ আর কুমিরকে হিং¯্র ও আক্রমণাত্মক বলে মনে হলেও জীবিকার সন্ধানে বনে যাতায়াতকারীদের এমনকি উপকণ্ঠে বসবাসকারী বন আবাদকারীদের সাথে তাদের সহমর্মিতার বোধ ছিল এবং তাদের মধ্যে অনুরণিত এই ঐকতানই সুন্দরবনকে সময়ের প্রেক্ষাপটে নানান দৈব দুর্বিপাক মোকাবেলা করেও টিকে থাকতে, মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সাহায্য করেছে। রচনা নিচয়ে সেই দর্শনই উজ্জীবিত হয়েছে। কেননা প্রাকৃতিক পরিবেশে সকলের সাথে সহাবস্থানের সহায়তার সহমর্মিতার সম্পর্ক থাকা আবশ্যক, কারোর সাথেই বৈরী অবস্থানে না যাওয়ার অনুপ্রেরণা এখান থেকেই। নিজেদের অস্তিত্বের স্বার্থে সকল জীবের মধ্যেকার বিবদমানতার বিস্বাদের সুর ছাপিয়ে তদস্থলে সহমর্র্মিতার সুর উচ্চগ্রামে ওঠা আবশ্যক। পরিবেশবাদীদের প্রত্যয় ও প্রার্থনাও তাই। 
 
গ্রন্থভুক্ত এগারোটি রচনা সুন্দরবনের পশুপাখি জীবজন্তুর সাথে সুন্দরবনের উপকণ্ঠে বসবাসকারী মানুষদের, বিশেষ করে যারা সিডর আর আইলায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের নিয়ে। বাকী দশটি ভিন্ন বিষয়ের, দেশ সমাজ ও অর্থনীতির পথের পাঁচালী, পরোক্ষভাবে সেগুলিও মূল ভাবধারা ও বিষয় সংশ্লিষ্ট। রম্যরচনার বৈঠকী ঢং সেখানেও সুস্পষ্ট, সমকালিন জীবন বোধ ও বিশ্বাসের বলয়ে চিন্তা-চেতনার চৌহদ্দীতেই যা পল্লবিত হয়ে উঠেছে। আশা করি অন্তর্লীন ভাবনার সায়রে ভাসা সেসব রচনাগুলো এই সংকলনে নিতান্ত অপাঙক্তেয় ও বেমানান ঠেকবে না। 
 
গ্রন্থভুক্ত নাম রচনাটি ২০১১ সালের ঈদ সংখ্যা ‘বৈচিত্র্য’তে প্রকাশিত হলে অনেকেরই সানন্দ প্রেরণা পাই এ জাতীয় লেখার এবং পরামর্শ বই আকারে বের করার। বৈচিত্র্য সম্পাদক প্রতিভাবান কবি শাহিন রেজা এবং তার অনুজ স্টক মার্কেট বোদ্ধা ও বিশিষ্ট ব্যংকার তুহিন রেজা সিডরকে নিয়ে আমার চিন্তাভাবনায় একাত্মতা প্রকাশ করে, কেননা সিডর বলেশ্বর নদীর মোহনা দিয়েই তাদের পৈত্রিক নিবাস পিরোজপুরে আক্রমন শানিয়েছিল। তুহিন তো বলেই ফেলল, ‘মামা মামলা (আজকাল যেটা কে উচ্চমানে রিট বলা হয়) করেন সিডর আইলা দুজনেরই নামে, টাকা যা লাগে আমার মেয়েরা যোগাবে। আশুতোষ বন্ধুত্বে আবদ্ধ শাহ মোহাম্মদ শোয়েব আলী আমার মত সুন্দরবনের নয়া আবাদী মাটিতে মানুষ, কয়রা উপজেলায় আইলায় ক্ষতিগ্রস্তদেরও একজন, নিজে একজন বড় ব্যাংকার, সেও রীট করার ব্যাপারে বরাবরই উৎসাহী। রীটের দলিল দস্তাবেজ সাক্ষীসাবুদ যোগাড় করতে দুবছর সময় চলে গেল। পরম স্নেহাষ্পদ মোহাম্মদ রুহুল আমিন তার সম্পাদিত সাপ্তাাহিক ‘আমার বাংলা’ পত্রিকায় ‘মানহানির মামলা’ প্রকাশ করেছিল। রুহুল আমিন আইন শাস্ত্রে উচ্চ ডিগ্রিধারী। তার বিজ্ঞ পরামর্শ পাব শুনে সিডর ও আইলা গংরা ইদানীং প্রমাদ গুনছে বলে প্রতীয়মান হয়। আমার সুহৃদ সহপাঠীরা- মোহাম্মদ আবদুল করিম ওরফে করিম মেম্বার, কাটুনিয়া রাজবাড়ী ডিগ্রী কলেজের অধ্যক্ষ আবু সাঈদ মাহমুদ, গৃহকত্রী ফাতেমা বেগম, ব্যবসায়ী অচ্যুৎ কুমার রক্ষিত, চিত্রশিল্পী সেখ সফি, হিসাব বিশেষজ্ঞ সেখ জালাল, ব্যাংকার আবদুস সাত্তার, সাধক কানাই কর্মকার, ধর্মদাস কর্মকার, চিত্ত চক্রবর্তী এরা সবাই সব সময় আমার রচনাসমূহের পরোক্ষ প্রেরণা। 
 
আমার সহধর্মিনী সেলিমা বেগম শোভা সুন্দর মিয়ার বাচন্ভঙ্গী ও সুন্দরবনাঞ্চলের আঞ্চলিক শব্দের বানান নিয়ে সতত সমালোচনা ও সংশোধনে সক্রিয় ছিলেন। সুদূর ক্যানাডার ভ্যানকুভারস্থ ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়া থেকে পুত্র আদীব মোহাম্মদ তওসীফ এবং যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কন্যা তানিয়া যারিফা মজিদের তাগিদ ছিল নিয়মিত। কনিষ্ঠা কন্যা বিথুন তাসনুভা মজিদ ছিল নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির আর্থ ক্লাবের সেক্রেটারী জেনারেল। সে সুন্দরবন, প্রাকৃতিক পরিবেশ ও পশুপাখি সংরক্ষণে পরিবেশবাদী আন্দোলনের কর্মী, গ্রন্থভুক্ত রচনাগুলো সব সময়ই ছিল তার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে। 
 
প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় সচেতনা বৃদ্ধিতে, অর্থনৈতিক ভাগ্য ্িবপর্যয়ে বিপর্যস্ত অসহায় মানুষ আর জীবজন্তুর ট্র্যাজিক জীবনযাপনের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশে এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অন্যায্য নিধনের প্রতি ধিক্কার জাগৃতিতে এই লেখাগুলো যদি কিছুটা হলেও অবদান রাখতে সক্ষম হয় তাহলে লেখকের শ্রমের আর সৃজনশীল প্রকাশক আমাদের সব্যব্যসাচী সুহৃদ গোলাম মোস্তফা সাহেবের পরিবেশ প্রীতির সার্থকতা প্রতিপন্ন হবে, এই-ই আকিঞ্চন প্রত্যাশা। বরাবরের ন্যায় এবারেরও একুশের বইমেলার বশংবদ ব্যস্ততার ধকল কাটিয়েও প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান হাক্কানী পরিবারের সবার, বিশেষ করে হেলাল ও বুলন বাবুর (ভূপতি ভূষণ রায় চৌধুরী) ঐকান্তিক আগ্রহ ও প্রয়াস প্রচেষ্টায় সুন্দর মিয়া সিরিজের দ্বিতীয় বই-এর আত্মপ্রকাশ সম্ভব হয়েছে। শিল্পী ও সাহিত্য সংগঠক বকুল হায়দার সিডর ও আইলা সম্পর্কে আমার আইডিয়া প্রচ্ছদ পরিকল্পনায় সামিল করেছেন। ডায়াবেটিক সমিতিতে আমার দাপ্তরিক সহকর্মী প্রকাশ কুমার নাথ এবং আফরোজা আকতারের সহাস্য সহযোগিতাকে সানন্দে স্মরণ করি। সুন্দরবনের সুন্দর মিয়ার সকল পরিষদের তরফ থেকেও আমি এ সুবাদে সকলকে জানাই বিশেষ কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ। 
 
 
মোহাম্মদ আবদুল মজিদ
 

সূচিপত্র

  • ফার্স্ট কাজিন কনফারেন্স, পৃষ্ঠা-১৩
  • বিশ্ব বাঘ সম্মেলন ঃ বাবাহকুর বিবৃতি , পৃষ্ঠা-২১
  • বগা আর বগী, পৃষ্ঠা-২৮
  • ছারপোকা মুক্ত কেবিন, পৃষ্ঠা-৩৪
  • কোটা স্মৃতি, পৃষ্ঠা-৩৮
  • একটি প্রমিত প্রতিবাদ, পৃষ্ঠা-৪১ 
  • একজন করম আলীর সালতামামী, পৃষ্ঠা-৪৬
  • পিতু পুত্রার প্রত্যাবর্তন, পৃষ্ঠা-৫০
  • একটি ছাগলের প্রটোকল জ্ঞান, পৃষ্ঠা-৫৪
  • সুন্দর বনের নিন্দা প্রস্তাব, পৃষ্ঠা-৫৯
  • মালতি নগরের মিলন মেলায়, পৃষ্ঠা-৬৩
  • নয় নম্বর নাটকিয়তা, পৃষ্ঠা-৬৭
  • মানহানির মামলা, পৃষ্ঠা-৭১
  • গোলকখালির গোলক ধাঁধায়, পৃষ্ঠা-৭৯
  • মহাভাবনার মহাসম্মেলন, পৃষ্ঠা-৮৩
  • সংবেদিত সংক্ষুব্ধতা, পৃষ্ঠা-৯০
  • পুনর্বিবেচনার বিবেচনা, পৃষ্ঠা-৯৫
  • সাদাকালো সমাচার, পৃষ্ঠা-৯৮
  • সত্য সুন্দরের সন্ধানে, পৃষ্ঠা-১০১
  • ষোল শতকের সমস্যা , পৃষ্ঠা-১০৫
  • সিডর ও আইলার বিরুদ্ধে রীট, পৃষ্ঠা-১১১
 

Specifications

  • বইয়ের লেখক: মোহাম্মদ আবদুল মজিদ
  • আই.এস.বি.এন: ৯৮৪৭০২১৪০০৯৬৬
  • স্টকের অবস্থা: স্টক আছে
  • ছাড়কৃত মূল্য: ১৫০.০০ টাকা
  • বইয়ের মূল্য: ২০০.০০ টাকা
  • সংস্করণ: প্রথম প্রকাশ
  • পৃষ্ঠা: ১১১
  • প্রকাশক: হাক্কানী পাবলিশার্স
  • মুদ্রণ / ছাপা: হাক্কানী পাবলিশার্স
  • বাঁধাই: Hardback
  • বছর / সন: ফেব্রুয়ারি ২০১৩

Share this Book

Sky Poker review bettingy.com/sky-poker read at bettingy.com