শেষ অধ্যায়

উৎসর্গ

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অগ্রণী ব্যক্তিত্ব

আমার মেজ মামা

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ’কে

 
 
 

কৃতজ্ঞতা...

 

কৃতজ্ঞতার সারিতে প্রমেই আমি চার কৃতী অভিনয় শিল্পীর নাম নিতে চাই। রাখি, সানজিদা প্রীতি, রিচি সোলায়মান এবং তাহসিন। এই গল্পের চার মূল চরিত্র আপনাদের আদলেই গড়ে উঠেছে। এই অনুপ্রেরণাটুকু না পেলে চরিত্রগুলোকে রূপ দেওয়া বাস্তবে আমার পক্ষে দুরূহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়াত। না জেনে এই সাহায্যটুকু করার জন্য আপনাদের সবাইকে
আমার আন্তরিক ধন্যবাদ।
 
এরপর আসে আমার বন্ধু আখতার মাহমুদ চৌধুরীর নাম। আইনের নানা বিষয়ে ভদ্রলোক আমাকে অনেক জ্ঞান দিয়েছেন। হাইকোর্ট দেখিয়েছেন কিনা জানি না, তবে আইনী প্রμিয়া সম্বন্ধে অজানা অনেক কিছু আমার জ্ঞাতার্থে এনেছেন। জেরাকারীর অবিরত, অবিশ্রান্ত, এবং অনেক ক্ষেত্রে অবান্তর প্রশড়ববানের মুখে ধৈর্য ধরে রাখার জন্য আখতার ভাইকে আমার লাল সালাম।
 
আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারে দিক নির্দেশনার জন্য সাকিব এবং তাহাসিন ভ্রাতৃদ্বয়কে অসংখ্য ধন্যবাদ। কেবল সাহায্য না, ওদের অনুপ্রেরণাটাও আমি সবিনয়ে স্মরণ করি। ওদের পাশে না পেলে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারের ইচ্ছাটা আমাকে হয়তো বাদই দিতে হতো।
 
সবশেষে আসে সেসব মানুষদের কথা যাদের সানিড়বধ্যে আমার জীবনটা শুধু সমৃদ্ধই হয় নি, আনন্দময়ও হয়েছে। সবার নাম বলতে গেলে তালিকা বেশ লম্বা হয়ে যাবে, তবে আমার বিশ্বাস আলাদা করে নাম না নিলেও সঠিক মানুষগুলোর কাছে কৃতজ্ঞতার বার্তাটা ঠিকই পৌঁছে যাবে। এরা সবাই আমার আশেপাশের মানুষ, আমার আপনজন। এরা কেউ আমার পরিবার, কেউ আমার বন্ধু, কেউ আমার মন্ত্রণাদাতা। এক অর্থে সবাই আমাকে যেভাবে দেখে, এরা তারই রূপকার।
 
 

...স্বীকারোক্তি...

 

আর এর অর্থ এই কাজে আমি একা না। ছায়ার মতো এরা সবাই আমার সাথেই আছেন। পাঠক হিসাবে এই কাজে এতটুকু ভাল খুঁজে পেলে এরা তার যোগ্য দাবিদার। এর যে খারাপটা আছে, তাতেও তারা সমানভাবে অংশীদার।
 
স্বীকারোক্তির তালিকায় আরেকটা কথা আমি স্পষ্টত বলে নিতে চাই।
 
এই গল্পের প্রতিটা চরিত্র এবং প্রতিটা নাম একেবারেই কাল্পনিক। কোনো উদ্দেশ্য নিয়ে, বা কারো কথা মাথায় রেখে নামগুলো রাখা হয় নি। এত মানুষের ভিড়ে বাস্তবে কারোর সাথে চরিত্রের কোনো নাম মিলে যাওয়াটা অসম্ভব না। এতে কেউ অসন্তুষ্ট হলে প্রমেই আমি হাত জোড় করে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।
 
 

...এবং প্রাসঙ্গিক কিছু ভাবনা

 

ক্ষমা আদায় করে এবার আমি নির্ভয়ে বলতে পারি গল্পের স্থান, কাল, পাত্র কাল্পনিক হলেও এর মূল বার্তাটা আমার কাছে অপরিচিত না। নিজেরই এক চরিত্রের সাথে সুর মিলিয়ে আমি বলতে চাই জীবনে ভাল, খারাপ দু’টাই আমি দেখেছি। এর কার্যকারণ না বুঝলেও যা বুঝি তা হলো ভাল, খারাপ, দু’টাই মানুষের জীবনে অপরিবর্তনীয় সত্য, আর এর বিচার করাটা আমাদের পক্ষে আসলেও দুরূহ ব্যাপার। এ নিয়ে বলতে গেলে অনেক কথা চলে আসে, তবে এর সারাংশ হলো মানুষ হয়ে মানুষের জন্য আমরা অনুভব করি। হাজার ধ্বংস, অনিষ্ট আর হানাহানির মাঝেও কথাটা সত্য। এর কারণ একটাই। আমরা সবাই হয়তো এক মায়েরই সন্তান। ধর্ম, বিজ্ঞান, দর্শন, যেই দৃষ্টিতেই দেখেন না কেন, এই সত্যের কোনো বিরোধিতা নেই। এই সহমর্মিতার কারণেই আশেপাশের মানুষদের আমরা বিচার করি। মজার ব্যাপার হলো এই সহমর্মিতার সাথে জন্ম নেয় আবেগের, আর এই বিচার প্রμিয়ায় আবেগটাই হয়ে উঠে আমাদের মূল মানদ-। এর ফলশ্রুতিতে যে রায়ে আমরা উপনীত হই, তা একদিকে যেমন আমাদের ভালর দিকে ঠেলে, অন্যদিকে তেমন খারাপ কাজের ন্যায্যতা দেখায়।
 
কথাটা ঠিক হলে কাউকে ভাল বা খারাপ বলে আখ্যায়িত করা কি আদৌ আমাদের সাজে? মানুষের কোন কাজে তার আসল পরিচয় পাওয়া যায়? কোন ভুলকে ক্ষমা করা যায়? কোন ভালটা সবার উপরে? যাকে বিচার করছি, তার সম্বন্ধে আমরা কতটুকু জানি? এই জানাটা কি তাকে নির্দিষ্ট কোনো আখ্যা দেওয়ার জন্য যথেষ্ট? এই প্রশড়বগুলো মাথায় রেখে বিচিত্র একগুচ্ছ চরিত্র আপনাদের সামনে তুলে ধরছি।
 
এই দীর্ঘ বক্তব্যের কারণ একটাই। প্রখ্যাত সাহিত্যিক উইলিয়াম সামারসেট মঅম এক সময়ে বলেছিলেন, “We do not write because we want to; we write because we have to.” নিজেকে আমি কোনো সাহিত্যিক বলে দাবি করছি না, তবে নির্ভাবনায় এতটুকু বলতে পারি : আমার জীবনের বড় একটা অংশ কিভাবে যেন এই পাতাগুলোতে মিশে আছে। কি কারণে যেন মনে হয়েছিল কাল্পনিক গল্পের আবরণে বললে কথাগুলো হয়তো কেউ শুনতে চাইবে।
 
যদি কেউ শুনার ইচ্ছা রাখেন, সর্বোপরি তাকেই আমি ধন্যবাদ জানাতে চাই।
 
 

পূর্বকথা

২০৩২ সাল

 
 

মায়া

“মা, মা, প্রিয়া খালা ফোন করেছে।” পাশের ঘর থেকে সুমির জোর গলা ভেসে আসলো।
 
“এই যে মা, এখানে, বসার ঘরে...” চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে মায়া সাড়া দিল। সুমির সাথে ওর প্রিয়া খালার বেশ খাতির। প্রায়ই দু’জনের কথা হয়। কি এত কথা বলে কে জানে। প্রিয়ার অবশ্য সব বাচ্চাদের সাথেই বন্ধুত্ব, যদিও সুমির সাথে বন্ধুত্বটা একটু বেশী। এই ভেবে মায়া মনে মনে হাসলো। আঠারো বছর বয়সে বাচ্চা বললে সুমি নিশ্চয়ই রাগ করবে, কিন্তু আদরের এই মেয়েটা কোনদিনই ওর চোখে বড় হবে না।
 
একমাত্র সন্তান হওয়ায় সুমির জীবনটা বেশ একাকী। বড় একজন চাচা আছেন, যদিও সপরিবারে বিদেশে থাকেন। ফুপু বলতে কেউ নেই, খালাও নেই। এক মামা থাকলেও তার সাথে তেমন একটা আসা যাওয়া নেই। এই একাকীত্বের মাঝে মায়ার এই বন্ধুটা সুমির হৃদয়ে আপন খালার জায়গা করে নিয়েছে। এটা যে কত বড় সান্ত¡না, মায়া বলে বুঝাতে
পারবে না। এসব ভাবার মাঝেই ফোনটা হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকে সুমি বললো, “ভিডিও দিব?” মায়া মাথা নেড়ে এই অস্থির প্রশেড়বর সম্মতি জানালে ফোনটা সামনের টেবিলে রেখে ভিডিও চালু করে সুমি মায়ের পাশে এসে বসলো।
 
ফোন থেকে প্রিয়ার হলোগ্রাফিক ছবি ভেসে উঠতেই সুমি প্রশড়ব করল, “গতকাল না তোমার আসার কথা ছিল?” মায়া আর বিরক্তি ধরে রাখতে পারলো না, “উফ সুমি, এখন যা তো। আমাদের কথা বলতে দে।” মায়ের বকুনিতে সুমির ঠোঁট ফুলানো দেখে প্রিয়া শান্ত স্বরে বললো, “সরি সুমি, গতকাল আসতে পারি নি। কাজ পড়ে গেছিল। পরে সময় করে আসবো। তোমার মার সাথে একটু কথা বলি?”
 
সুমির অনিচ্ছুক প্রস্থানের পর মায়ার দিকে তাকিয়ে হেসে প্রিয়া বললো, “সুমির উপরে রাগ কোরো না। আমি বলেছিলাম আসবো। বেচারী হয়তো আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। শুনো, যে কারণে ফোন করলাম, রাতের প্রোগ্রামে কি বলবে ঠিক করেছ?”
 
মায়া মাথা নাড়ালো, “মোটামুটি চিন্তা করেছি। আচ্ছা প্রিয়া, ব্যাপারটা কেমন হয়ে গেল না? আমাদের এত বড় অর্জন। অ্যাওয়ার্ড নেওয়ার সময় শুধু আমরা দু’জন থাকবো? সবাই একসাথে...”
 
এই কথায় দীর্ঘশ্বাস ফেলে প্রিয়া বন্ধুর দিকে তাকালো, “আসলেও, সবাই থাকতে পারলে ভাল হতো। কিন্তু কিছু করার নাই।” ক্ষণিকের নিরবতায় দুই বন্ধু আপন ভাবনায় হারিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর আস্তে করে প্রিয়া বললো, “আমরা অনেক দূর আসলাম, তাই না মায়া?”
 
চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে আনমনা হয়ে মায়া বললো, “আসলেও, আমরা অনেক দূর আসলাম। কোনদিন ভাবতেও পারি নি আমরা একদিন বেস্ট এক্সপোর্ট অ্যাওয়ার্ড পাবো।”
 
সকালের প্রম রোদ পূবের জানালা ভেঙ্গে ঘরে এসে পড়েছে। বত্রিশ তলায় থাকাতে মায়ার বাসায় বেশ রোদ আসে। ঘরের মেঝেতে লম্বা ছায়া দেখে কেন জানি ওর পুরানো দিনগুলোর কথা মনে পড়ে গেল। বন্ধুকে মনের কথাটা জানিয়ে ও বললো, “কয়েকদিন ধরে খুব আগের কথা মনে পড়ছে প্রিয়া।”
 
“আমারও।” প্রিয়ার চোখেও নিঃশব্দ একটা আকুতি।
 
“রোকসানা ফোন করে আমাদের ইন্টারভিউর জন্য একটা সময় চেয়েছে। ও আমাদের শুরুর কথা জানতে চায়।”
 
“কোন রোকসানা? বিজনেস উইকলির রিপোর্টার?”
 
“হ্যাঁ।”
“সময় দিয়েছো?”
“হ্যাঁ। আগামীকাল সকাল এগারোটায় ও অফিসে আসবে। তুমি থেকো কিন্তু।”
“থাকবো। রোকসানা আমাদের শুরুর কথা জানতে চায় কেন? ওর রিপোর্টে তো এতকিছু লাগবে না।” কৌতূহলের সাথে প্রিয়া জিজ্ঞেস করল।
 
“জানি না।” মাথা ঝেঁকে মায়া বললো। “এমনি জানতে চায় হয়তো। সাংবাদিকের কৌতূহল। শুনো, আমি সন্ধ্যা সাতটার মধ্যে ভেন্যুতে পৌঁছে যাবো। তুমিও ঐ সময়ে চলে এসো।”
 
“ঠিক আছে।” বন্ধুর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে নরম স্বরে প্রিয়া জিজ্ঞেস করল, “মন খারাপ করছো কেন মায়া? আজ তো খুশির দিন।”
 
অ্যাওয়ার্ডের কথা জানার পর থেকেই মায়ার মনটা কেন জানি ভারি হয়ে আছে। এরকম একটা খুশির খবরের পরও কিসের এত শূন্যতা? বাইরের কাউকে ওদের পুরানো কথা বললে কি ভাল লাগবে? হয়তো লাগবে। তাহলে কিসের এত অস্থিরতা? উত্তর না পেয়ে মায়া বললো, “ঠিকই বলেছো। আজ তো খুশির দিন। উই শুড সেলিব্রেট। মন খারাপ না।
আগের কথা মনে হচ্ছিল।”
 
মায়ার কথায় প্রিয়া কি যেন চিন্তা করল। তারপর বললো, “জানো, আমাদের পুরানো সেই ছবিটা খুঁজে পেয়েছি। আমাদের চারজনের একসাথে তোলা প্রম ছবি। মাহিদ ভাই তুলেছিল। তোমার মনে আছে?”
 
অবসাদের এক ক্লান্ত ছায়া মায়ার চোখে হঠাৎ ভেসে উঠলো, “মনে আছে প্রিয়া।” তারপর জোরে শ্বাস ফেলে বললো, “ছবিটা এখনও তোমার কাছে আছে? আমারটা আর খুঁজে পাই নি।”
 
“সেদিন পুরানো জিনিস ঘাটতে ঘাটতে হঠাৎ একটা বইয়ের মধ্যে খুঁজে পেলাম। কাল অফিসে নিয়ে আসবো। দেখো।”
 
“ঠিক আছে প্রিয়া, দেখব। সন্ধ্যায় দেখা হবে, এখন রাখি?”
“ঠিক আছে, দেখা হবে।” বলে প্রিয়া ফোনটা রেখে দিল।
 
বন্ধুর প্রতিকৃতিটা সামনে থেকে মিলিয়ে যাওয়ার পর উদাসীন দৃষ্টিতে মায়া জানালার বাইরে তাকালো। নিজের অজান্তেই পুরানো সব কথা ওর মনে এসে ভিড় করল। সময়ের সাথে স্মৃতিগুলো আবছা হয়ে আসলেও একটু ভাবলেই আবার সব মনে পড়ে যায়। মায়ার বিশ্বাসই হতে চায় না এগুলো ওর নিজের স্মৃতি। মনে হয় অন্য কারো জীবনী ওর চোখের সামনে মঞ্চস্থ হচ্ছে। সময় কি এতটাই পার হয়ে গেছে যে অতীতের মঞ্চে নিজেকে ও এখন দর্শকের আসনে বসিয়েছে? বেশ কয়েকদিন ধরে এই স্মৃতিগুলো ওকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। এ কারণেই হয়তো রোকসানার সাথে কথা বলার জন্য ও ব্যাকুল হয়ে আছে।
 
মায়া উঠে দাঁড়াল। অফিসে গিয়ে কাজে ডুবে থাকলে হয়তো কিছুটা হালকা লাগবে। এই ভেবে ও অফিসের দিকে রওনা হলো। কিন্তু এতেও লাভ হলো না। কাজের চাপেও সময় কাটতে চাইলো না। জরুরী কাজগুলো শেষ করে বাসায় ফিরে অস্থির প্রতীক্ষায় ও বাকি দিনটা পার করে দিল। দেখতে দেখতে সন্ধ্যা হয়ে আসলো। ছয়টার দিকে বাসা থেকে বার
হয়ে ও প্রিমিয়ার কনফারেন্স সেন্টারের দিকে রওনা হলো।
 
মাত্র বছর খানেক হলো অত্যাধুনিক, সুবিশাল এই কনফারেন্স সেন্টারটা উদ্বোধন হয়েছে। দেশের বড় বড় আন্তর্জাতিক মানের সভাগুলো আজকাল এখানেই হয়ে থাকে। পূর্বাচলের শীতলক্ষ্যা নদীর পাশে চল্লিশ তলার উপর চমৎকার এই কেন্দ্রটা নতুন ঢাকার গর্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ রাতে এখানে জাতীয় পর্যায়ে বর্ষসেরা রপ্তানীকারকদের সম্মাননা দেওয়া হবে। বিভিনড়ব ভাগে পাঁচটা প্রতিষ্ঠানকে খেতাব দেওয়ার ঘোষণা করা হয়েছে। পোশাক রপ্তানী ক্ষেত্রে ক্যাপিটাল ফ্যাশনস এ বছর জাতীয় খেতাব পেতে যাচ্ছে। পোশাক রপ্তানী ছাড়া ভার্চুয়াল ট্রেইনিং, এনিমেশন, বায়ো ফুয়েল উৎপাদন আর জৈব সার রপ্তানীতে সেরা প্রতিষ্ঠানগুলোর নামও ঘোষিত হয়েছে। দেশীয় ব্যবসায়ীদের সবচেয়ে বড় এই আসরটা প্রতি বছরের মতো এ বছরও বেশ ঘটা করে আয়োজিত হচ্ছে। সরকারী বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের নামি দামি ব্যক্তিত্বদের পাশাপাশি দেশী বিদেশী সংবাদ সংস্থার প্রতিনিধিরা সন্ধ্যা থেকেই কনফারেন্স সেন্টারে ভিড়
জমানো শুরু করেছে।
 
নদী তীরে অবস্থিত বিশাল এই ভবনের প্রবেশ পথটা সেতু দিয়ে অপর পাড়ের সাথে সংযুক্ত। পুরো সেতুটা আজ আলোতে ঝলমল করছে। অতিথিদের গাড়িগুলো সেতু পেরিয়ে ধীরে ধীরে সভা কেন্দ্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। গাড়িতে বসে মায়া নদীর উপর কনফারেন্স সেন্টারের উজ্জ্বল আলোর প্রতিফলন দেখছিল আর ভাবছিল অ্যাওয়ার্ড নেওয়ার সময় কি বলবে। কি বলে ক্যাপিটাল ফ্যাশনসের এত বড় অর্জনে সবার অবদান ও স্বীকার করবে?
 
ভাবতে ভাবতে মায়ার গাড়িটা সভা কেন্দ্রের কাছে চলে আসলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই ওকে নামতে হবে। সাংবাদিক আর ফটোগ্রাফারদের ভিড়ে প্রবেশ পথটা গমগম করছে। আয়োজনটা যে এত বড় হবে, মায়া ভাবতেও পারে নি। গাড়ি থেকে নামতেই আয়োজকদের প্রতিনিধিরা ওকে ভিতরে নিয়ে গেল। ফটোগ্রাফারদের ফ্লাশের আলোতে রীতিমত চোখ ধাঁধানোর মতো অবস্থা।
 
অনুষ্ঠানের মূল হলে বিশাল আয়োজন। কয়েক’শ অতিথির গুঞ্জনে সভাকক্ষটা গমগম করছে। নির্ধারিত টেবিলের কাছে এসে মায়া দেখল বাদ বাকি সবাই চলে এসেছে। প্রিয়ার চেয়ারটা ঘিরে বেশ ভিড়। বেশ কিছু অতিথি ওর চারপাশে বসে মশগুল হয়ে গল্প করছে। কয়েকটা চেয়ার পরেই ওদের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর পারভেজ আর
বিজনেস ডেভেলপমেন্ট ডিরেক্টর ইমরান নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। প্রিয়াকে ঘিরে শুভাকাক্সক্ষীদের ভিড় দেখে মায়া মনে মনে হাসলো। অভিনন্দন জানাতে আসলেও কি কারণে এখনও ওনারা বিদায় নিতে পারেন নি, সে কথা ভাবতে ভাবতে ও টেবিলের কাছে চলে আসলো। শুভাকাক্সক্ষীরা উঠে দাঁড়ালে প্রিয়ার পাশের চেয়ারটায় ও জায়গা করে নিল।
 
মায়া সবসময় নিজের চরিত্রের সাথে মানানসই সাজ দিতে পছন্দ করে। ও জানে সাদা শিফন শাড়ীতে ওকে বেশ মানায়। আজ হালকা মেকআপের সাথে নির্মল এই বেশে সৌন্দর্যের পাশাপাশি ওর চরিত্রের আত্মপ্রত্যয়ী ভাবটাও সুন্দর ফুটে উঠেছে। আর প্রিয়ার কথা একবারেই আলাদা। ওকে সবসময়ই সুন্দর দেখায়। বিশ বছর আগে সবাই যেভাবে
ওকে সুন্দর বলতো, এখনও তাই বলে। তবে বয়সের সাথে এই সৌন্দর্যে নতুন একটা মাত্রা যোগ হয়েছে। এখন ওর মার্জিত ভাবটাই সবার আগে নজর কাড়ে। এ কারণে মায়ার চোখে এখনকার প্রিয়া আরো বেশী সুন্দর।
 
কিছুক্ষণ পর শুভাকাক্সক্ষীরা ধীরে ধীরে বিদায় নিলে আয়োজকদের প্রধান এসে ওদের ফুলের তোড়া দিয়ে গেলেন। শুভেচ্ছা জানানোর পর উনি বললেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এসে পৌঁছালেই অনুষ্ঠান শুরু হবে। আধা ঘণ্টা পর প্রধানমন্ত্রী পৌঁছালেন। তারপর দীর্ঘ বক্তৃতার পর্ব পেরিয়ে ধীরে ধীরে মূল অনুষ্ঠানের কাজ শুরু হলো। রাত
গড়াতে থাকলে একে একে চার ভাগে পুরস্কার দেওয়ার কাজ শেষ হলো। এখন বাকি ক্যাপিটাল ফ্যাশনসের নাম ডাকা। পুরস্কার নেওয়ার সময় সব কোম্পানীর শীর্ষ ব্যক্তিরা সতীর্থদের কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আয়োজকদের ধন্যবাদ দিয়ে গেছেন। কিন্তু সতীর্থদের কথা বলে তো মায়ার কথা শেষ হবে না। ওর তো অনেক কিছু বলার আছে। কিন্তু এই কথা কি কেউ শুনবে?
 
জোর করতালিতে মায়া হঠাৎ বাস্তবে ফিরে এলো। ওকে ডাকা হচ্ছে। “সুধী ম-লী,” পিএ সিস্টেম থেকে এমসির সুরেলা কণ্ঠ ভেসে আসলো, “পোশাক রপ্তানী খাতে অনন্য অবদানের জন্য ক্যাপিটাল ফ্যাশনস লিমিটেড ২০৩১ সালের জাতীয় বাণিজ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির সিইও মিসেস আফরিদা জামান মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে সম্মাননা পদক গ্রহণ করবেন।”
 
পদক নেওয়ার কাজটা বেশ দ্রুত সম্পনড়ব হয়ে গেল। এবার কিছু বলতে হবে। মায়া ডায়াসে উঠে দাঁড়াল। সামনে অতিথিদের সাগর। প্রিয়া কোথায়? এত মানুষের ভিড়ে ওকে খুঁজে পাওয়ার উপায় নাই। বেশ একা লাগলো মায়ার। এরকম তো কথা ছিল না। ওদের কোনো কিছুই তো একা করার কথা না। সবসময় যে ওদের সাহস দিয়েছে, পথ দেখিয়েছে, সেই তো আজ নেই... ওর কথা বললে কি কেউ বুঝবে? কেউ না বুঝলেও প্রিয়া তো বুঝবে... সবাই মায়ার দিকে তাকিয়ে আছে। শুরু করা দরকার।
 
“মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, সম্মানিত মন্ত্রীবর্গ, বিশিষ্ট অতিথিবৃন্দ : ক্যাপিটাল ফ্যাশনসকে এই বিশেষ সম্মাননা দেওয়ার জন্য আমার সহকর্মীদের পক্ষ থেকে সবাইকে আমি অশেষ ধন্যবাদ জানাই। আমাদের চার বন্ধুর গড়ে তোলা ছোট এই প্রতিষ্ঠানটা আজ দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশী লেবেল প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হয়েছে। দেশের নাম আন্তর্জাতিক বাজারের নতুন এই অঙ্গনে প্রচার করতে পেরে ক্যাপিটাল ফ্যাশনস আজ প্রকৃত অর্থে ধন্য। এই সাফল্যে ব্যবস্থাপনা পরিষদের সাথে প্রতিষ্ঠানের সকল কর্মচারী সমানভাবে অংশীদার।”
 
কথা আগাতে গিয়ে নিজের অজান্তেই মায়ার কন্ঠ জড়িয়ে আসলো। এত কষ্ট হচ্ছে কেন? একটু থেমে গলা পরিষ্কার করে নিজেকে ও সামলে নিল। তারপর চারিদিকে তাকিয়ে আবার শুরু করল।
 
“হাঁটতে শেখার আগে একটা শিশু ছোট একটা পা ফেলে। এটাই মানুষের জীবনের প্রম ধাপ। এই ধাপটাই মানুষকে সামনের দিকে নিয়ে যায়, ভবিষ্যতের জন্য তাকে তৈরী করে। আমাদেরও এরকম ছোট একটা পা ফেলতে হয়েছিল। যার হাত ধরে প্রম এই পা আমরা ফেলেছিলাম, সেই মানুষটা আজ আমাদের সাথে নাই। একসাথে কাজ করে নিজ
যোগ্যতায় আমরা যে কিছু অর্জন করতে পারি, সেই বিশ্বাসটা জাগানোর জন্য এই মানুষটার কাছে আমরা সবাই কৃতজ্ঞ। এই বিশ্বাসটা জাগাতে না পারলে আজ এই অনুষ্ঠানে আমাদের কারোরই হয়তো স্থান হতো না।”
 
একটু থেমে মায়া জোরে শ্বাস নিল। কষ্ট হলেও কথাটা ওকে শেষ করতে হবে।
 
“আজ এখানে দাঁড়িয়ে আরেক বন্ধুকে আমি স্মরণ করতে চাই। প্রম পা ফেলার পর যার অনুপ্রেরণায় আমরা সোজা পথে চলতে পেরেছিলাম, সেও আজ আমাদের সাথে নাই। ওর থেকে আমরা যা পেয়েছি, তা ভাষায় প্রকাশ করা আমার পক্ষে সম্ভব না। শুধু বলতে পারি ভাল মানুষ হিসাবে জীবনে যাদের চিনেছি, তাদের সবাইকে আমরা এখনও এই
বন্ধুর মানদ-ে বিচার করি। ও শুধু আমাদের বন্ধুত্বকেই শক্ত করে নি, আমাদের সবাইকে ভবিষ্যতের উপর আশাবাদী হতে শিখিয়েছে।
 
“এই দুই বন্ধুকে পাশে না পেলে প্রম ধাপেই আমরা হোঁচট খেতাম। শুরুতেই আমাদের যাত্রা ব্যর্থ হতো। ওদের দু’জনকে আরেকবার স্মরণ করে শেষ একটা কথা বলে বিদায় নিতে চাই। ক্যাপিটাল ফ্যাশনসের আজকের এই অর্জন দেখে দেশের কোনো তরুণতরুণী যদি সামান্যতম উৎসাহ পেয়ে থাকে; যদি মনে করে থাকে এই অর্জন ওদের জন্যও
অসাধ্য না, তাহলেই এই দুই বন্ধুর ঋণ কিছুটা হলেও আমরা শোধ করতে পারবো।
 
“সবাইকে আরেকবার ধন্যবাদ জানিয়ে শেষ করছি।”
 
মায়া সবসময় কম কথা বলা পছন্দ করে। আজ ও চেয়েছিল বেশী কিছু বলতে, কিন্তু তা আর হয়ে উঠলো না। তবে দর্শকদের করতালি শুনে মনে হলো কম কথাই সবার পছন্দ হয়েছে। টেবিলে পৌঁছুতেই প্রিয়া ওকে জড়িয়ে ধরলো। বন্ধুর টলটলে চোখ দেখে মায়ার চোখও ভিজে আসলো। প্রিয়াকে ধরে কোনরকমে ও কানড়বা চেপে রাখলো। পাশের মানুষরা হয়তো ভাবছে এটা আনন্দের অশ্রু, কিন্তু ওরা দু’জনই কেবল জানে এই অশ্রুর আসল কারণ কি।
 
নিজেকে সামলে নেওয়ার পর পাশ থেকে রোকসানার নরম গলা শুনে মায়া ঘুরে তাকালো। কি সুন্দর হাসি মেয়েটার। এরকম নির্মল হাসি এক মুহূর্তে অচেনাকে আপন করে নিতে পারে, দুঃখীর দুঃখ দূর করতে পারে। কার সাথে এই হাসির এত মিল?
 
“রোকসানা, কেমন আছো?” হাসি মুখে মায়া বললো।
 
“জ্বী, ভাল। কনগ্রাচুলেশন্স! খুব সুন্দর বলেছেন ম্যাডাম।” মায়ার সাথে হাত মিলিয়ে রোকসানা বললো।
 
“থ্যাংক ইউ। পরিচয় করিয়ে দেই, আমার কলিগ, প্রিয়া।”
 
রোকসানা ঘুরে প্রিয়ার দিকে তাকালো। তারপর হাতটা বাড়িয়ে বললো, “স্লামালেকুম, প্রিয়া ম্যাডাম। আপনাকে এই প্রম দেখলাম, যদিও আপনার কথা মায়া ম্যাডামের কাছে অনেক শুনেছি। আপনারা বসেন। এখন আর বিরক্ত করবো না। আগামীকাল কথা হবে।”
 
আগামীকাল কথা হবে। কিন্তু তাতে কি মন হালকা হবে? উত্তর না পেয়ে রোকসানার দিকে তাকিয়ে মায়া অল্প করে একটু হাসলো।
 
 
 

Specifications

  • বইয়ের লেখক: শাহরিয়ার হোসেন
  • আই.এস.বি.এন: ৯৮৪৭০২১৪০১০৮৬
  • স্টকের অবস্থা: স্টক আছে
  • ছাড়কৃত মূল্য: ২৬৫.০০ টাকা
  • বইয়ের মূল্য: ৩৫০.০০ টাকা
  • সংস্করণ: প্রথম প্রকাশ
  • পৃষ্ঠা: ৪৩৩
  • প্রকাশক: হাক্কানী পাবলিশার্স
  • মুদ্রণ / ছাপা: টেকনো বিডি ইন্টার ন্যাশনাল
  • বাঁধাই: Hardback
  • বছর / সন: নভেম্বর, ২০১৪

Share this Book

Sky Poker review bettingy.com/sky-poker read at bettingy.com