প্রথম রৌদ্রের আলো

উৎসর্গ

 
 

ফরিদ আহ্মেদ ভূঞা

পড়ালেখাতেই যার আনন্দ

 
 
 
 
 
 

লেখকের প্রকাশিত অন্যান্য বই

 
  • ১. সিয়েরালিয়নের স্মৃতি 
  • ২. বাংলাদেশের ছোটগল্পঃ জীবন ও সমাজ 
 

প্রথম

 
 
হেডমাস্টার সাহেবের বিচার হবে। আজ সন্ধ্যার পরে। সংবাদটা ছড়িয়ে পড়লো বন্যার জলের মতো। আশেপাশের গ্রাম থেকে অনেক লোক এসে জড়ো হয়েছে বাজারে। বৃহস্পতিবারের হাট। লোকে লোকে ভরে গেছে দোকানপাট। সন্ধ্যার আগেই উৎসাহী লোকেরা বাজারের কাজ সেরে নিচ্ছে। বাজার পেরোলেই স্কুল। মাঝখান দিয়ে চলে গেছে ইউনিয়ন পরিষদের মোটা রাস্তা। রাস্তার পাশেই জনাকয়েক নরসুন্দর জলচৌকিতে বসা খদ্দেরের মাথায় কচাকচ কাঁচি চালিয়ে যাচ্ছে। শুধু একজন নাপিত হাতাওয়ালা একটি চেয়ারে বসিয়ে সৌখিনদের মাথা মালিশ করছে। অন্যদের চেয়ে তার রেট একটু বেশি। সামান্য দূরেই পোস্ট অফিস। লোকজন লাইন ধরে জানালার গ্রিলের ফাঁকে হাত ঢুকিয়ে পোস্টকার্ড অথবা লেফাফা কিনে নিচ্ছে। কেউ উঠাচ্ছে মানি অর্ডারের টাকা। কেউ লাল বাক্সটির ভিতরে চিঠি ফেলছে। পাশে যতীন্দ্রমোহন ডাক্তারের ওষুধের দোকান। স্কুলের শিক্ষকরা  অবসরে সেখানে পত্রিকা পড়তে আসে। 
 
 
এলাকায় শরীফপুর হাইস্কুলের অনেক নামডাক। সামনে বিরাট মাঠ। মাঠের দুই পাশে দুই গোল-পোস্ট দাঁড়িয়ে আছে পরিত্যক্ত তোরণের মতো। মাঠের একপাশে হাঁসমুরগির বাজার। আরেক পাশে বাঁশ ও বেতের তৈরি দৈনন্দিন সামগ্রীর পসরা। বাজারের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে বসে রমেশ পাইকার। প্রতি বৃহস্পতিবারে সে আসে কুমিল্লা শহর থেকে। সস্তায় গৃহস্থবাড়ির ডিম, কলা,আতা,জাম্বুরা,ডালিম,পাকা পেঁপেঁ ও অন্যান্য ফল-পাকরা পাইকারি দরে কিনে নিয়ে যায়। শহরে রাজগঞ্জ বাজারে তার ছোটভাই পরেশ স্থায়ী দোকানে বসে এসকল দ্রব্য ভাল দামে বিক্রি করে। 
 
 
সারা মাঠ জুড়ে সবুজ ঘাস। কোরবানীর ঈদে এখানেই বসে পশু বিক্রির হাট। এলাকার গণ্যমান্য লোক মারা গেলে এ মাঠেই পড়ানো হয় জানাজার নামাজ। আজ মাঠে কেউ বল নিয়ে নামে নি। বিকেলের নরম রোদে সবুজ ঘাসের উপর চিৎ হয়ে কয়েকজন শুয়ে আছে জটলা বেঁধে। দলে দলে লোকজন বসে আছে মাঠের বিভিন্ন স্থানে। পশ্চিমে লক্ষণ মুচির বাড়ি। আঙ্গিনায় কয়েকটি শূকর বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে কলাবাগানে মাটি খোঁড়াখুঁড়ি করছে। মাঠের উত্তর পাশে শহীদ মিনার। সেখানে বসেছে মলম এবং কুওত বাহার হালুয়া বিক্রির আসর। মলমের নাম আশ্চর্য মলম। কাটা ঘা, খোঁস-পাঁচড়া, চুলকানি ইত্যাদি প্রায় সকল রোগের অব্যর্থ মহৌষধ। ভেসিলিনের মধ্যে স্প্রিট বা মেনথলের মতো ঝাঁঝালো কোন রাসায়নিক মিশিয়ে এ মলম তৈরি করা হয়েছে। বিক্রির পদ্ধতিটা বেশ আকর্ষণীয়। প্রথমে আনাড়ী ধরনের জাদু, তারপর চিকন মেয়ের নাচ ও বানরের খেলা। ফাঁকে-ফাঁকে চলে হালুয়া ও মলমের বিক্রি। দর্শকদের অনেকেরই ধারণা, মাত্র তিন কৌটা হালুয়া সেবনে যেকোন পুরুষের শরীরে চলে আসতে পারে বাঘের শক্তি।
 
 
রঙ্গিন গামছা দিয়ে গলায় ঝুলানো হারমোনিয়ামের সুরে চলছে-‘বেদের মেয়ে জোছ্না আমায় কথা দিয়াছে; আসি-আসি করে জোছ্না ফাঁকি দিয়াছে’। সপ্তাহে একদিন করে নজরআলি ক্যানভাসার সঙ্গী সাথীদের নিয়ে শহর থেকে আসে মলম বিক্রি করতে। তার সারা মুখে বসন্তের দাগ। মাথায় খেজুর পাতার সাহেবী হ্যাট। চোখে সেনালী চেপটা ফ্্েরমের চশমা। স্কুলের ছাত্র, তরুণ, বৃদ্ধ সবাই এসে ভীড় জমায় ঔষুধ বিক্রির আসরে। সন্ধ্যার পর আজ আর দর্শক ধরে রাখতে পারছে না নজরআলি। সবারই মুখে মুখে হেডমাস্টারের বিচারের কথা।
 
 
শরীফপুর হাইস্কুল এই অঞ্চলের সবচেয়ে প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এই স্কুলের বহু ছাত্রছাত্রী আজ দেশের বিভিন্ন পর্যায়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। স¦াধীনতার পর এই শরীফপুর স্কুলের অদূরেই গড়ে তোলা হয় শরীফপুর এইচ খান (হাসমতউল্লাহ খান) বালিকা বিদ্যালয়। এলাকার বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা শিল্পপতি মোসাদ্দেক আলী ও তার শ্বশুর হাসমতউল্লাহ খানের প্রচেষ্টায় নিজস্ব জমিতে স্থাপন করা হয় বিদ্যালয়টি। স্কুল উদ্বোধনের দিন অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি উপস্থিত ছিলেন। বক্তৃতার এক পর্যায়ে হাসমতউল্লাহ খান বলেছিলেন - শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড। পুরুষের সাথে মেয়েদেরকেও শিক্ষিত করে তোলা আমাদের দায়িত্ব। তবে, মেয়েরা যাতে ইজ্জতের সাথে শরীয়ত বজায় রেখে আলাদা স্কুলে পড়তে পারে সেজন্যই তিনি নিজের জমিনে গার্লস স্কুল স্থাপনে এগিয়ে এসেছেন। এখন থেকে এই এলাকায় কোন মেয়েকে আর ছেলেদের স্কুলে যেতে হবে না।
 
 
এরপর ভাষণ দিতে মঞ্চে ওঠেন বিশেষ অতিথি শিক্ষা উপদেষ্টা জনাব শফরআলি। মঞ্চে উঠতেই তিনজন লাল পেড়ে সাদা শাড়ি পরিহিতা কিশোরী উপদেষ্টার গলায় একের পর এক ফুলের মালা পরিয়ে দিল। গলার মালা টেবিলের উপর রেখে পাঞ্জাবির হাতা কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে নিয়ে তিনি বজ্রকন্ঠে বক্তৃতা শুরু করেন। গলার কারুকাজ, স্বরের ওঠানামা, চোখ, মুখ ও হাতের অঙ্গভঙ্গি দ্বারা তিনি উপস্থিত জনতাকে সম্মোহিত করে ফেলেন। শফর ভাই জিন্দাবাদ, ধ্বনির সময়ে তাকে কয়েকবার বক্তৃতা থামাতে হলো। এক পর্যায়ে তিনি বললেন, আমি দুইবার নির্বাচনে দাঁড়ালাম। কিন্তু, কিছু লোকের বেইমানিতে পাস করতে পারলাম না। বিভিন্ন চক্রান্তে আমি আপনাদের সেবা করার সুযোগ পাই নি। ভোটের জন্যে আমার কোন দুঃখ নেই। খোদার মেহেরবানীতে বর্তমান সরকার ইলেকশান ছাড়াই আমাকে একজন মন্ত্রীর মর্যাদা দিয়েছে। আমি এখন মাননীয় সরকার বাহাদুরের বিশেষ উপদেষ্টা হিসাবে দায়িত্ব পালন করছি। এলাকার যেকোন প্রকার সমস্যা সমাধানে নিজেকে জড়িত করতে পারলে আমি খুশি হবো। আপনারা যেকোন প্রয়োজনে আমার কাছে আসতে পারেন। আমি এই এলাকার ছেলে। আপনাদেরই সন্তান। ঢাকার মিন্টুরোডের বাড়ির দরজা সবসময় আপনাদের জন্য খোলা থাকবে। বক্তৃতায়, আচার-আচরণে মনে হলো এলাকার উন্নয়নে, জনগণের কল্যাণে তিনি সংকল্পবদ্ধ। তবে, এলাকাবাসীর ধারণা আগামী নির্বাচনে তার স্থলে এম.পি হিসাবে মোসাদ্দেক আলি অধিষ্ঠিত হবে।
 
 
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আরেকটি আকর্ষণ ছিল নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের নাম ঘোষণা করা। মুক্তিযোদ্ধা মোসাদ্দেক আলী প্রথমেই বললেন, যেহেতু এখনো পর্যন্ত মহিলা হেডমাস্টার পাওয়া যাচ্ছে না, তাই গভর্নিং বডি এলাকার সন্তান জনাব শামসুল হক বিএ, বি-এড কে হেডমাস্টার হিসাবে নিয়োগ দিয়েছে। তিনি এলাকার জনাব চানমিয়া পাইকারের ছেলে। শহরের একটি স্কুলে তিনি হেডমাস্টার হিসাবে বেশ সুনাম অর্জন করেছিলেন। রাজনৈতিক কোন্দলের কারণে তিনি সেখানে টিকতে পারেন নি। তাই তাকে আমরা যথাযোগ্য মর্যাদায় এখানে প্রধান শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ দিয়েছি।
 
২ জন শিক্ষক ও ২ জন শিক্ষিকার পরিচিতির মাধ্যমে সেদিনের স্কুল উদ্বোধন অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয়েছিল। অনুষ্ঠানের পর কানাঘুষা হয়েছিল যে, মোসাদ্দেক আলীর আতœীয়-স্বজন ও পরিবারের বাইরে কাউকে নিয়োগ দেয়া হয় নি। 
 
 
আজ বিচার হবে শরীফপুর এইচ খান বালিকা বিদ্যালয়ের সেই হেডমাস্টার জনাব শামসুল হক বিএ, বি-এড এর। মাগরিবের নামাজের পর দোকানে দোকানে কেরোসিনের কুপি এবং হারিকেন জ্বালানো হয়েছে। আসন্ন সন্ধ্যার আগমনে চারদিকে আবছা আবছা ভাব। সামান্য দূরের কারো চেহারা মালুম করা যাচ্ছে না। কাছে আসার পর দেখা গেল একদল তরুণ হেডমাস্টার সাহেবকে সোজা নিয়ে এসেছে মাঠের পূর্বকোণে। তাকে একটি চেয়ারে বসানো হলো। একটু দূরেই বসানো হয়েছে আরেক আসামী সুফিয়া বেগমকে। সুফিয়ার পাশে রয়েছে পাঁচ বছরের মেয়ে রাজিয়া। মাঝখানে টেবিলের উপর রাখা আছে ইউনিয়ন বোর্ড অফিসের নতুন কেনা হ্যাজাক বাতি। ইউনিয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান জনাব জব্বর আলি হেডমাস্টার সাহেবের বাল্যবন্ধু। তিনি চট্টগ্রামে মেয়ের বাসায় বেড়াতে গিয়েছেন। তাই আজকের বিচারে থাকতে পারছেন না। সে কারণে বিচারের দায়িত্ব পড়েছে তরুণ সংঘের উপর। হ্যাজাক বাতির গম্গম্ শব্দ ও উজ্জ¦ল আলোকে হাজার হাজার মশা-মাছি ও বিভিন্ন পতঙ্গ দলে দলে স্বেচ্ছায় আতœাহুতির প্রতিযোগিতায় নেমেছে। সারা মাঠের পরিবেশে একটা উৎসবমুখর ভাব। সমবেত জনতা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে বিচারের রায় শোনার জন্য। এলাকার বখাটে ছেলে সেন্টুমিয়া কয়েকজন ছেলেকে নিয়ে উত্তর পাশের নিকটতম ক্লাসরুম থেকে আরো কয়েকটি চেয়ার ও দুইটি টেবিল নিয়ে এল। চেয়ার-টেবিলগুলো রাখার পর সেন্টুমিয়া হেডমাস্টারের কাছে গিয়ে বললো, দেখি স্যার একটু দাঁড়ান তো। হেডমাস্টার দাঁড়াতেই সে বললো, দেখেন সবাই, ভাল কইরা দেখেন। ইনি আমাদের গার্ল স্কুলের সম্মানিত হেডস্যার। হেডমাস্টার দুচোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর সেন্টু দুইহাতে গায়ে ধরে বললো, বসেন স্যার, বসেন। চেয়ারটি তখনই কেউ পেছন থেকে সরিয়ে নিলে শামসুল হক চিৎপটাং হয়ে পড়ে যান। অতঃপর তিনি রাগ করে নরম ঘাসের উপরই বসে পড়েন। হাততালি, চিৎকার ও শিষ ধ্বনিতে চারদিক গরম হয়ে ওঠে। মাস্টার সাহেব কাদায় ফেসে যাওয়া হাতির মতো নিশ্চুপ হয়ে রইলেন। এসব দেখে সুফিয়া বেগম নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলো না।
 
আপনাদের এভাবে একজন মানী লোকেরে অপমান করা ঠিক না।
 
আরে রাখ্ তোর বক্তিমা। বেশরম মাগী কাঁহাকার। কথা বলিস না। 
 
সেন্টুমিয়ার কথা শেষ না হতেই কোমরে আঁচল পেঁচিয়ে সুফিয়া দাঁড়িয়ে যায়।
 
চুপ কর হারামজাদা। কথা কইস না। আমি কোন চোর ডাকাত না। আমারে মাইয়া মানুষ পাইয়া সক্কলের মুখ খুলে গেছে। আমি কাউরে ডরাই না। সুফিয়ার তর্জন গর্জন দেখে কলিম মেম্বার দাঁড়িয়ে বললো,
 
সুফিয়া তুই অন্যায় করছস, চুপচাপ বসে থাক। বেশি বড় কথা কইছ্ না।
 
সাথে সাথে সুফিয়া বলে উঠলো,
 
আপনার চরিত্র সকলের জানা আছে। কাজের মাইয়ার লগে ধরা খাইছেন। এইখানে আর মেম্মরগিরি দেখাইয়েন না।
 
পেছন থেকে কফিল মিয়া বলে উঠলো,
 
মেম্বর সাব, হিজরা মাইয়ার লগে কথা কইয়া ইজ্জত থাকবে না। এইডা হইল কলিকাল, ছাগলে চাডে বাঘের গাল।
 
বৃদ্ধ দরবেশআলি নিজে নিজেই বলে গেল, কি ছিল আর কি হল। মাইয়াডা অভাবে আর দুঃখে পাগল হয়া গেছে।     
 
সুফিয়া আবার উঠে কফিলের দিকে তাকাতেই কয়েকজন ছেলে পেছন থেকে বিভিন্ন রকমের শিশ ধ্বনি দিতে থাকলো। এমন সময়ে সকলের দৃষ্টি পড়লো আগমনরত বিচারকের উপর। দশ-বারোজন লোক সঙ্গে নিয়ে, দুটি হ্যাজাক বাতিসহ বিচারক এসে পৌঁছাতেই বারেক মোল্লার ছেলে রফিক উচ্চকন্ঠে ঘোষণা করলো : ভাইসব, গার্ল স্কুলের হেডমাস্টার এবং সুফিয়া বেগমের বিচার এখনই শুরু হবে। আপনারা হাঁটাহাঁটি না করে সবাই বসেন, বসে পড়েন।
 
 

Specifications

  • বইয়ের লেখক: ড. মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
  • আই.এস.বি.এন: ৯৮৪৭০২১৪০১০০০
  • স্টকের অবস্থা: স্টক আছে
  • ছাড়কৃত মূল্য: ১৫০.০০ টাকা
  • বইয়ের মূল্য: ২০০.০০ টাকা
  • সংস্করণ: প্রথম প্রকাশ
  • পৃষ্ঠা: ১৬০
  • প্রকাশক: হাক্কানী পাবলিশার্স
  • মুদ্রণ / ছাপা: হাক্কানী প্রিন্টিং এন্ড প্যাকেজিং
  • বাঁধাই: Hardback
  • বছর / সন: ফেব্রুয়ারি ২০১৪

Share this Book

Sky Poker review bettingy.com/sky-poker read at bettingy.com