দুটি ঐতিহাসিক রায়

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা

ঐতিহাসিক স্থানসমূহ সংরক্ষণ

 
দুটি ঐতিহাসিক
রায়
 
 
সম্পাদনায় 
মনজিল মোরসেদ 
এ্যাডভোকেট
সুপ্রীমকোর্ট অব বাংলাদেশ
 
 

উৎসর্গ

আমার পিতা
স্বাধীনতা যুদ্ধের বীর সৈনিক
মুক্তিযোদ্ধা মরহুম জবেদ আলি মিয়ার
স্মৃতির উদ্দেশ্যে
 
 

ভূমিকা

 
বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা নিয়ে একটি স্বার্থান্বেষী মহলের ষড়যন্ত্রমূলক ও বিভ্রান্তিকর অপপ্রচার শুরু হয় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর হতেই। তারই ধারাবাহিকতায় ২০০৪ সালে “স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র” পুনঃর্মুদ্রণ করে তৃতীয় খণ্ডের ১ম পৃষ্ঠায় স্বাধীনতা ঘোষণা সংক্রান্ত অসত্য ও বিকৃত তথ্য সন্নিবেশিত করা হয়। সরকারের উক্ত প্রকাশনা বাতিলের দাবিতে রীট মামলাটি দায়ের করা হয়। মামলার রায়ে স্বাধীনতা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবার প্রেক্ষাপট এমনভাবে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে যাতে স্বাধীনতার ঘোষণা সংক্রান্ত সকল বিভ্রান্তি ও অপপ্রচার চিরদিনের জন্য বন্ধ হবে বলে আমার বিশ্বাস।
 
বাঙালি জাতির স্বাধীনতা আন্দোলনে যে কটি ঐতিহাসিক ঘটনা স্মরণযোগ্য তার সাথে সোহরাওয়ার্দ্দী উদ্যানের সম্পৃক্ততা অবিচ্ছেদ্য। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এ ঐতিহাসিক স্থানের গুরুত্ব ও মর্যাদা তুলে ধরা এবং স্থানগুলো চিহ্নিতকরণের মাধ্যমে স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসকে অক্ষুণœ রাখার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশনা চেয়ে জনস্বার্থে একটি রীট মামলা দায়ের করা হয়।
 
বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত সোহরাওয়ার্দ্দী উদ্যানের জায়গাসমূহ সংরক্ষণের জন্য দায়েরকৃত রীট মামলার রায়ে প্রদত্ত নির্দেশনার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের স্থান, পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পনের স্থানসহ মুক্তিযুদ্ধকালে যেসব বধ্যভূমিতে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করা হয়েছে সেগুলো এবং যুদ্ধকালীন সময়ে নিহত মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনীর সৈনিকদের সমাধিগুলো চিহ্নিতকরণ ও সংরক্ষণের পথ সুগম হবে।
 
উভয় রীট মামলার বাদী পক্ষের আইনজীবী হিসেবে মামলা পরিচালনাকালীন বিভিন্নভাবে তথ্য উপাত্ত দিয়ে দেশ-বিদেশের যারা সহযোগিতা করেছেন তাদের নিকট আমি কৃতজ্ঞ। স্বাধীনতা ঘোষনার মামলায় এমিকাস কিউরিয়া হিসেবে সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার এম, আমির-উল ইসলাম শুনানীতে অংশগ্রহণ করে গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করার জন্য তাঁর নিকট কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।
 
ঐতিহাসিক স্থানসমূহ সংরক্ষণ মামলার শুনানীতে বিজ্ঞ অ্যাটর্নি জেনারেল জনাব মাহবুবে আলম সাহেবের পজিটিভ ভূমিকার জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
 
স্বাধীনতা ঘোষণা সংক্রান্ত মামলার বাদী ডাঃ এম. এ. সালাম এবং ঐতিহাসিক স্থানসমূহ সংরক্ষণ সংক্রান্ত-এর মামলার বাদী মেজর জেনারেল (অবঃ) কে.এম. শফিউল্লাহ ও অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন-কে তাদের সাহসিকতা ও আগ্রহের জন্য ধন্যবাদ জানাই। এ দুটি ঐতিহাসিক মামলার রায় প্রদানকারী বিচারক জনাব বিচারপতি এ.বি.এম. খায়রুল হক এবং বিচারপতি মোঃ মমতাজ উদ্দিন আহমেদ তাঁদের এ ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে চিরজীবি হয়ে থাকবেন বলে আমি বিশ্বাস করি।
 
 
মনজিল মোরসেদ
(Manzill Murshid)
এডভোকেট
সুপ্রীম কোর্ট অব বাংলাদেশ।
 
 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা

[ ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা ] 

 
 

বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট

হাইকোর্ট বিভাগ

(ষ্পেশাল অরিজিন্যাল জুরিস্ডিকশান)

রীট পিটিশন নং ২৫৭৭ /২০০৯

 
ইন দি ম্যাটার অফ
ইহা বাংলাদেশ সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী একটি আবেদন পত্র;
ইন দি ম্যাটার অফ
ডাঃ এম, এ, সালাম
দরখাস্তকারী
 
বনাম
 
বাংলাদেশ সরকার পক্ষে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ক্যাবিনেট বিভাগের
সচিব এবং অন্যান্য
প্রতিবাদীগণপক্ষে।
 
জনাব মনজিল মোরসেদ, এ্যাড্ভোকেট্
দরখাস্তকারীপক্ষে
 
জনাব এম, ইনায়েতুর রহীম, অতিরিক্ত অ্যাটর্ণি- জেনারেল, সঙ্গে
জনাব মুস্তাফা জামান ইসলাম, ডি,এ,জি
৪ নং প্রতিবাদীপক্ষে
 
জনাব মোঃ মুনসুরুল হক চৌধুরী, এ্যাড্ভোকেট্
৯ নং প্রতিবাদীপক্ষে
 
জনাব খন্দকার মাহবুব উদ্দিন আহম্মেদ সঙ্গে
জনাব মোঃ রুহুল কুদ্দুস এবং
জনাব নাসির উদ্দিন আহমেদ,এ্যাড্ভোকেট্বৃন্দ
১১ নং প্রতিবাদীপক্ষে
 
জনাব এম, আমির-উল ইসলাম
এমিকাস কিউরিয়া
 
শুনানী ঃ মে ২০,২১, ২৭, ২৮ ও জুন ০১, ২০০৯ ইং
রায় প্রদান ঃ জুন ২১, ২০০৯ ইং
 
উপস্থিত ঃ
বিচারপতি জনাব এ,বি,এম, খায়রুল হক
এবং
বিচারপতি জনাব মোঃ মমতাজ উদ্দিন আহমেদ
 
 
বিচারপতি এ,বি,এম, খায়রুল হক
 

পটভূমিকা

বাংলাদেশ সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত বাংলাদেশের স¦াধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্র পনের খন্ড সিরিজ গ্রন্থের ২০০৪ সনের পূনর্মুদ্রণকৃত তৃতীয় খন্ডের প্রথম পৃষ্ঠায় মুদ্রিত বাংলাদেশের ‘প্রথম স¦াধীনতা ঘোষণা’ বর্ণনার আইনানুগ বৈধতা চ্যালেঞ্জ করিয়া ও সেই সম্পর্কিত অন্যান্য নির্দেশনা প্রার্থনা করিয়া অত্র রীট্ মোকাদ্দমাটি দায়ের করা হইয়াছে।
 

সূত্রপাত ও রুল জারী

 
দরখাস্তকারী এম, এ, সালাম একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং পেশায় চিকিৎসক। তিনি ১৯৮৩ সনে মেডিসিন শাস্ত্রে পি,এইচ, ডি, ডিগ্রী লাভ করেন। দরখাস্তে বর্ণনা করা হয় যে, একজন মুক্তিযোদ্ধা ও সচেতন নাগরিক হিসাবে তিনি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস স¤¦ন্ধে অবগত আছেন। তাহার জানামতে ইহা ঐতিহাসিক সত্য যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালী জাতির অবিসংবাদি নেতা হিসাবে ১৯৭১ সনের ২৬ মার্চ তারিখের প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স¦াধীনতা ঘোষণা প্রদান করিয়াছিলেন। কিন্তু সম্প্রতি ২০০৪ সনের জুন মাসে পুনর্মুদ্রিত বাংলাদেশের স¦াধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র গ্রন্থ সিরিজের তৃতীয় খন্ডের প্রথম পৃষ্ঠায় মেজর জিয়াউর রহমান ২৭ মার্চ ১৯৭১ তারিখে প্রথম স¦াধীনতা ঘোষণা করিয়াছিলেন বলিয়া বর্ণনা দেখিয়া তিনি বিসি¥ত হন। তৎপর, তাহার আইনজীবী মারফৎ প্রতিবাদীগণ বরাবরে ১৩-৪-২০০৯ তারিখে একটি Demand of Justice Notice জারী করিয়া ২০০৪ সনে মুদ্রিত গ্রন্থটি বাজেয়াপ্ত করিবার জন্য পদক্ষেপ গ্রহন এবং যে সকল ব্যক্তি বাংলাদেশ সৃষ্টির ইতিহাস বিকৃত করিয়াছেন তাহাদের বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহন করিবার জন্য অনুরোধ করেন (এ্যানেকচার-এ)। কিন্তু তাহাতে কোন ফলোদয় না হওয়ায় অত্র রীট্ মোকাদ্দমাটি দায়ের করিলে অত্র আদালত বাংলাদেশ সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুসারে ২০-৪-২০০৯ তারিখে প্রতিবাদীগণ বরাবরে নিম্নলিখিত রুল জারী করে ঃ

“Let a Rule Nisi be isused calling upon the respondents to show cause as to why the impugned publication of June, 2004 edition of “History of Bangladesh War of Independence”, published by the Ministry of Liberation War Affairs, Government of Bangladesh, so far as it relates to the declaration of independence of Bangladesh at Page 1 in 3rd Volume, should not be declared ultra vires and is of no legal effect and why a declaration should not be made to impose a ban on the distribution of the said publication and further to confiscate all publication/published editions in reference to the reprint of the said volume printed in June 2004 by the Ministry of Liberation War Affairs and directing the respondents to initiate necessary investigation followed by appropriate legal action against the perpetrators of the distortion of the national history of Bangladesh and also direct the respondents to provide the Hon’ble Court copies or photo-stat copies, duly athenticated, of all newspaper publications, published from 1st March to 25th March, 1971, from the office of the Director of Library and National Archives, Government of Bangladesh and/or such other or further order or orders passed as to this Court may seem fit and proper.

The Rule is made returnable within 3(three) weeks from date.

Requisites to be put in at once.

 

Mr. M. Enayetur Rahim, the learned Additional Attorney General, appears on behalf of the respondent-Government.

 

Let a copy of this Rule be forwarded to the learned Attorney General, Government of Bangladesh, immediately.”

 

পক্ষগণ ও তাহাদের লিখিত বক্তব্য

২৮-৪-২০০৯ তারিখে হলফকৃত একটি দরখাস্তের মাধ্যমে জনাব বেলাল মোহাম্মদ ও মেজর রফিকুল ইসলাম, বীর উত্তম, কে পক্ষভুক্ত করিবার জন্য আবেদন করা হয়। ৩-৫-২০০৯ তারিখের আদেশ বলে তাহাদিগকে যথাক্রমে ৯ ও ১০ নং প্রতিবাদী হিসাবে পক্ষভুক্ত করা হয়। ২০-৫-২০০৯ তারিখে হলফকৃত একটি এফিডেভিট্ মারফৎ ৯ নং প্রতিবাদী পক্ষে তাহার বক্তব্য দাখিল করা হয়। ৬-৫-২০০৯ তারিখে হলফকৃত একটি দরখাস্ত মারফৎ এম হামিদুল্লাহ খান, বীর প্রতীক, অত্র মোকাদ্দমায় পক্ষভুক্ত হইবার জন্য একটি আবেদন করেন। কিন্তু দরখাস্তকারী পক্ষে ১৩-৫-২০০৯ তরিখে হলফকৃত একটি এফিডেভিট্-ইন-রিপ্লাই মারফৎ ইহাতে আপত্তি উত্থাপন করা হয়। উভয়পক্ষের শুনানী অন্তে ১৩-৫-২০০৯ তারিখের এক আদেশ বলে জনাব এম, হামিদুুল্লাহ খানকে ১১ নং প্রতিবাদী হিসাবে পক্ষভুক্ত করা হয়। তিনি ২৭-৫-২০০৯ তারিখে হলফকৃত একটি এফিডেভিট্ দাখিল করতঃ তাহার বক্তব্য উপস্থাপন করেন। ২০-৫-২০০৯ ও ১-৬-২০০৯ তারিখে হলফকৃত এফিডেভিট্গুলি মারফৎ ৪ নং প্রতিবাদীপক্ষে বক্তব্য দাখিল করা হয়। ২০-৫-২০০৯ তারিখে হলফকৃত একটি এফিডেভিট্ মারফৎ সেক্টর কমান্ডারস্ ফোরাম-এর পক্ষে ইহার সেক্রেটারী- জেনারেল লেফ্টেনেন্ট জেনারেল এম, হারুন অর রশিদ (অবঃ), বীর প্রতীক, অত্র মোকাদ্দমায় পক্ষ ভুক্ত হইবার আবেদন করিলে ২১-৫-২০০৯ তারিখের এক আদেশ বলে সেক্টর কমান্ডারস্ ফোরামকে ১২ নং প্রতিবাদী হিসাবে পক্ষভুক্ত করা হয়। তাহাছাড়া, দরখাস্তকারীপক্ষে বিভিন্ন তারিখে হলফকৃত সম্পূরক হলফনামা দাখিল করা হয়। মোকাদ্দমার শুনানীর শেষ পর্যায়ে জনাব এম, এ, মান্নান ২৭-৫-২০০৯ তারিখে একটি আবেদনপত্র এবং ২৮-৫-২০০৯ তারিখে হলফকৃত আর একটি স¤পূরক হলফনামা দাখিল করতঃ পক্ষভুক্ত হইবার জন্য আবেদন করিলে তাহা নথিভুক্ত রাখা হয় তবে রায় প্রদানের পূর্বে যদি তাহারা কোন দলিলাদি দাখিল করেন তবে তাহা বিবেচনা করা যাইবে বলিয়া ২৮-৫-২০০৯ তারিখে আদেশ প্রদান করা হয়। কিন্তু তিনি শেষ পর্যন্ত কোন দলিলাদি দাখিল করেন নাই।
 
১১ নং প্রতিবাদী দরখাস্তে বর্ণিত বিভিন্ন বর্ণনা এবং প্রার্থনা অস¦ীকার করতঃ তাহার এফিডেভিট ইন অপজিশান মারফৎ বক্তব্য পেশ করেন। ‘বাংলাদেশের স¦াধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্র’ গ্রন্থ সিরিজের ৩য় খন্ডের প্রথম পৃষ্ঠায় মুদ্রিত বিবরণ যে মেজর জিয়াউর রহমান ২৬-৩-১৯৭১ তারিখে স¦াধীনতা ঘোষনা করিয়াছেন তাহা দৃষ্টে দরখাস্তকারী বিসি¥ত হইয়াছেন বলিয়া তাহার দরখাস্তে যে বর্ণনা করিয়াছেন তাহা ১১ নং প্রতিবাদী বিভ্রান্তিকর ও উদ্দেশ্য প্রণোদিত বলিয়া অস¦ীকার করেন। দরখাস্তকারীর বক্তব্য যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২৬-৩-১৯৭১ তারিখে স¦াধীনতা ঘোষণা করিয়াছিলেন তাহা পক্ষভুক্ত এই প্রতিবাদী অস¦ীকার করেন। তিনি বর্ণনা করেন যে উপরোক্ত গ্রন্থের ১৯৮২ ও ২০০৩ সনের মুদ্রণের বর্ণনা যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২৬-৩-১৯৭১ তারিখে স¦াধীনতা ঘোষনা করিয়াছিলেন তাহা প্রামানিক দলিলের অন্তর্ভূক্ত। তাহা ঐ সময় পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য ভিত্তিক। সে স¤¦ন্ধে কোন মন্তব্যের প্রয়োজন নাই। কিন্তু পরবর্তীতে প্রাপ্ত নির্ভরশীল ঐতিহাসিক তথ্য ও ঘটনাবলীর উপর ভিত্তি করিয়া ২০০৪ সনের মুদ্রিত দলিল পত্রে বর্ণনা করা হইয়াছে। দরখাস্তের বর্ণনা যে দরখাস্তকারী যেহেতু একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন সেইহেতু ১৯৭১ সনের ৭ই মার্চ তারিখের ঘোষণা এবং স¦াধীনতা ঘোষণার সত্যকার ইতিহাস স¤¦ন্ধে অবহিত এবং পরবর্তীতে ইতিহাস বিকৃতি করণ সম্পর্কে অবহিত ইত্যাদি বর্ণনা স¤¦ন্ধে ১১ নং প্রতিবাদী তথ্যঘটিত প্রশ্ন বলিয়া বর্ণনা করেন যে এ স¤¦ন্ধে তাহার উপলব্ধি ও তথ্য দরখাস্তকারীর বক্তব্যকে সমর্থন করে না। দরখাস্তের ৬ দফায় প্রদত্ত বর্ণনা সত্য নয় বলিয়া তিনি বলেন যে, উক্ত গ্রন্থের ১৯৮২ ও ২০০৩ সনের মুদ্রণে ব্যক্ত তথ্যাদি পরবর্তীতে সংশোধনযোগ্য। তাহাছাড়া, স¦াধীনতা ঘোষণায় ইহা বলে না যে শেখ মুজিবুর রহমান স¦াধীনতা ঘোষণা করিয়াছিলেন।
 
এফিডেভিটের ৯ দফায় বর্ণনা করা হয় যে বাংলাদেশের স¦াধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র এর ২০০৪ সনের পূনর্মুদ্রণের ৩য় খন্ডের ১ম পৃষ্ঠায় বর্ণনা করা হয় যে মেজর জিয়াউর রহমান ২৬-৩-১৯৭১ তারিখে যে স¦াধীনতা ঘোষণা করিয়াছিলেন তাহাও প্রামানিক দলিলের অন্তর্ভূক্ত এবং পূর্বতন মুদ্রণগুলি সঠিক কিন্তু সর্বশেষ মুদ্রণটি ভ্রান্ত ইহা অস¦ীকার করা ব্যতিত তাহার অন্য কোন মন্তব্য নাই। আরও বর্ণনা করা হয় যে মেজর জিয়াউর রহমান যে স¦াধীনতা ঘোষণা করিয়াছিলেন এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইবার কারণাবলী উক্ত খন্ডের ৪র্থ পৃষ্ঠায় ‘স¦াধীনতা ঘোষণাঃ প্রত্যায়ন কমিটির অভিমত’ এ বর্ণনা করা হইয়াছে (এ্যানেক্চার-১)।
 

ঐতিহাসিক স্থানসমূহ সংরক্ষণ

[ সোহরাওয়ার্দ্দী উদ্যান, বধ্যভূমি, মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনীর সমাধিক্ষেত্র ]
 
 

বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট

হাইকোর্ট বিভাগ

(স্পেশাল অরিজিন্যাল জুরিসডিকশান)
রীট পিটিশন নং ৪৩১৩/২০০৯
ইন দি ম্যাটার অফ
ইহা বাংলাদেশ সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুসারে একটি আবেদনপত্র;
এবং
ইন দি ম্যাটার অফ
মেজর জেনারেল কে, এম, শফিউল্লাহ ও অন্য একজন।
দরখাস্তকারীদ্বয় 
 
বনাম
 
বাংলাদেশ গং
প্রতিবাদীগণ
 
জনাব মনজিল মোরসেদ, এ্যাড্ভোকেট্
দরখাস্তকারীদ্বয় পক্ষে
 
জনাব মাহবুবে আলম, অ্যাটর্ণি-জেনারেল সঙ্গে
জনাব মোস্তফা জামান ইসলাম, ডেপুটি অ্যাটর্ণি-জেনারেল,
জনাব ইকরামুল হক এবং বেগম মাহফুজা, এ,এ,জি,
প্রতিবাদী সরকার পক্ষে
 
শুনানী ঃ ৬ ও ৭ জুলাই, ২০০৯ইং
রায় প্রদানঃ জুলাই ০৮, ২০০৯ইং
 
উপস্থিত
 
বিচারপতি জনাব এ,বি,এম, খায়রুল হক
এবং
বিচারপতি জনাব মোঃ মমতাজ উদ্দিন আহমেদ
 
বিচারপতি এ,বি,এম, খায়রুল হক
 

পটভূমিকা

ইহা জনস্বার্থমূলক একটি রীট্ মোকাদ্দমা।
মূলতঃ তদানীন্তন রেসকোর্স ময়দান, বর্তমান সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানের ঐতিহাসিক স্থান সমূহ চিহ্নিত করতঃ সংরক্ষণ করিবার প্রার্থনা করিয়া অত্র রীট্ মোকাদ্দমাটি দায়ের করা হইয়াছে। 
 

সূত্রপাত ও রুল জারী

অত্র রীট্ মোকাদ্দমার ১ নং দরখাস্তকারী একজন স্বনামধন্য মুক্তি যোদ্ধা এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রাক্তন সেনাপ্রধান। তিনি ১৯৫৫ সনে পাকিস্তান মিলিটারী একাডেমী হইতে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করতঃ সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট পদে কমিশন লাভ করেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রারম্ভে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে মেজর পদ মর্যাদায় জয়দেবপুরস্থ ১ম বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড ইন্ কমান্ড পদে কর্মরত ছিলেন। ১৯শে মার্চ তারিখে তাহার বাহিনীর দৃঢ়তার জন্য ব্রিগেডিয়ার আব্রার উক্ত বাহিনীকে নিরস্ত্র করিতে পারে নাই। মুক্তিযুদ্ধের প্রথমেই তিনি বিদ্রোহ করেন এবং সেক্টর কমান্ডার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। তাহাছাড়া, S-Force নামে একটি ইন্ফ্যান্ট্রী ব্রিগেডের অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সনের ১৬ ই ডিসে¤¦র তারিখে রমনা রেসকোর্স ময়দানে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিদলের একজন সদস্য হিসাবে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পন অনুষ্ঠান অবলোকন করেন। ১৯৭২ সনের ৬ই এপ্রিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সেনা প্রধান পদে নিয়োগ লাভ করেন এবং ১৯৭৫ সনের ২২শে অগাষ্ট পর্যন্ত উক্ত পদে বহাল থাকেন। তৎপর তাহাকে বৈদেশিক মন্ত্রনালয়ে বদলি করা হয় এবং তিনি ১৯৯১ সন পর্যন্ত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত পদ মর্যাদায় দায়িত্ব পালন করেন। অতঃপর ১৯৯৬ সনে তিনি জাতীয় পরিষদে সাংসদ নির্বাচিত হয়েন। 
 
২ নং দরখাস্তকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের একজন স¦নামধন্য অধ্যাপক। তিনি ১৯৭৪ সনে ইতিহাস বিভাগে একজন প্রভাষক হিসাবে যোগদান করেন। ১৯৮৩ সনে তিনি ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশ রিসার্চ ইন্ষ্টিটিউট এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক। তিনি বাংলা একাডেমির একজন ফেলো এবং ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচিত সিনেট সদস্য। তাহাছাড়া, তিনি ৭১ এর ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। তিনি ইতিমধ্যে তাহার পান্ডিত্যের স¦ীকৃতি স¦রুপ বহু সংখ্যক পুরস্কার প্রাপ্ত হইয়াছেন। 
 
উভয় দরখাস্তকারী নিখাদ বাঙালি। উভয়ই পাকিস্তান শাসনামল প্রত্যক্ষ করিয়াছেন। বাঙালির সৃষ্ট পাকিস্তানে বাঙালি জাতি কিভাবে নিগৃহীত হইত এবং কিভাবে ঘটনার বাঁকে বাঁকে ইতিহাস সৃষ্টি হইয়াছিল তাহা তাহারা প্রত্যক্ষ করিয়াছিলেন একজন সামরিক বিভাগে চাকুরীরত অবস্থায় অন্যজন ছাত্র অবস্থায়। ১ নং দরখাস্তকারী জীবন বাজী রাখিয়া মুক্তিযুদ্ধ করিয়া ইতিহাস সৃষ্টি করিলেন। অন্যজন মুক্তিযুদ্ধকে তাহার লেখনীর মাধ্যমে প্রতিনিয়ত উপলব্ধি করিলেন। পরবর্তীকালে উভয়ই বাঙালি জাতির ইতিহাস বিকৃতি প্রত্যক্ষ করিলেন এবং ঐতিহাসিক স্থানগুলি কিভাবে বেদখল হইয়া গেল তাহাও অত্যন্ত বেদনার সহিত অবলোকন করিলেন। তাহাদের এই বেদনার্ত উপলব্ধি হইতেই তাহারা তাহাদের বিজ্ঞ কৌশুলী মারফৎ বাংলাদেশের স¦াধীনতার সহিত ওতপ্রোতভাবে জড়িত ঐতিহাসিক স্থানগুলি রক্ষা করিবার জন্য একটি Demand of Justice Notice ১৮-৬-২০০৯ তারিখে প্রদান করেন (এ্যানেকচার-বি)। কিন্তু তাহাতে কোন ফলোদয় না হওয়ায় বাংলাদেশ সংবিধানের ২৪ অনুচ্ছেদের আওতায় বাংলাদেশের ঐতিহাসিক স্থানগুলি রক্ষণাবেক্ষণে বাংলাদেশ সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব যাচ্ঞা করিবার উদ্দেশ্যে অত্র রীট্ মোকাদ্দমাটি দায়ের করিলে অত্র আদালত সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের আওতায় ২৫-৬-২০০৯ তারিখে নিম্নলিখিত Rule Nisi প্রতিবাদীগণ বরাবরে জারী করে ঃ
 
 

“Let a Rule Nisi be issued calling upon the respondents to show cause as to why a direction should not be given upon the respondents to form a committee to identify the historic important places at Shuhrawardi Uddyan (the then rececourse maidan) at Dhaka, where the Pakistan Army surrendered before the Joint Command Force of Mukti Bahini and Indian Army on 16th December, 1971 and where Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman delivered the historic speech on 7th March, 1971, after demolishing the structures, if any, around those historical places and recover to it’s original historic position and/or pass such other or further order or orders as to this Court may seem fit and proper.

The Rule is made returnable on 5.7.2009.

Since the learned Attorney General appears, let the matter be treated as ready, still the notices be served upon the respondents.

Let the matter be fixed for hearing on 6.7.2009, at the top of the list.”

 

  ৪ নং প্রতিবাদী পক্ষে ৭-৭-২০০৯ তারিখে হলফকৃত একটি এফিডেভিট দাখিল করিয়া দরখাস্তে উত্থাপিত বক্তব্য সমর্থন করেন।
 

পক্ষগণের আইনজীবী ও তাহাদের বক্তব্য

জনাব মনজিল মোরসেদ, এ্যাড্ভোকেট্, দরখাস্তকারীদ্বয় পক্ষে বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তাহাকে সমর্থন করিয়া বক্তব্য পেশ করেন জনাব আব্দুল বাসেত মজুমদার, ড. রাবেয়া ভূঁইঞা, জনাব এ, এফ, এম, মেজবাহউদ্দিন ও জনাব শ. ম. রেজাউল করিম, এ্যাড্ভোকেট্বৃন্দ। সরকার পক্ষে বক্তব্য উপস্থাপন করেন জনাব মাহবুবে আলম, অ্যাটর্ণি জেনারেল এবং তাহাকে সহায়তা করেন জনাব মোস্তফা জামান ইসলাম, ডেপুটি অ্যাটর্ণি-জেনারেল।
 
জনাব মনজিল মোরসেদ, এ্যাড্ভোকেট, তাহার বক্তব্যের প্রারম্ভে বাঙালি জাতির ইতিহাস সংক্ষেপে তুলিয়া ধরেন। স¦াধীন রাষ্ট্র হিসাবে পাকিস্তানের আত্মপ্রকাশ ও তৎপর সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালি জাতির বঞ্চনার ইতিহাস এবং কিভাবে ধাপে ধাপে স¦ায়ত্ত শাসনের দাবী স¦াধীনতার দাবীতে পরিণত হইল তাহার বিবরণ তুলিয়া ধরেন। এ প্রসঙ্গে তিনি ৬ দফা দাবী উপস্থাপন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, সাধারণ নির্বাচন, ১৯৭১ সনের মার্চ মাসের স¦াধীনতা আন্দোলন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর ৩রা মার্চ ও ৭ই মার্চের ভাষণ, স¦াধীনতা ঘোষণা, মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৭১ সনের ১৬ই ডিসে¤¦র রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পন, ১৯৭২ সনের ১০ই জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন, ১৭ই জানুয়ারি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ঢাকা আগমন ইত্যাদি বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনা বর্ণনা করিয়া তিনি উক্ত ঐতিহাসিক স্থান সমূহ বাংলাদেশ সংবিধানের ২৪ অনুচ্ছেদ অনুসারে বিকৃতি, বিনাশ বা অপসারণ হইতে রক্ষা করতঃ স¦মহিমায় রক্ষণ করিবার জন্য নিবেদন করেন। তিনি বলেন যে ১৯৭৫ সনের অগাষ্ট মাসের পর হইতেই উপরোক্ত ঐতিহাসিক স¥ৃতি বিজড়িত স্থান সমূহ ক্রমান¦য়ে বিলুপ্ত করিবার একটি নিশ্চিত প্রয়াস চলিয়া আসিতেছে যাহাতে বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্ম বাঙালি জাতির গর্ব ও সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন বিস¥ৃত হয় এবং অবশেষে বিলুপ্ত হয়। সেই বিলুপ্তির হাত হইতে আমাদের জাতির ঐতিহাসিক স¥ৃতি চিহ্নগুলি সংরক্ষণ করিবার সাংবিধানিক দাবী লইয়াই অত্র দরখাস্তকারীদ্বয় এই রীট্ মোকাদ্দমাটি দায়ের করিয়াছেন।
 
এই প্রসঙ্গে তিনি আরও নিবেদন করেন যে মুক্তিযুদ্ধকালীন ৯ (নয়) মাস ব্যাপি সময়ে বাংলাদেশে ৩০ (ত্রিশ) লক্ষ মানুষ শহীদ হইয়াছেন, কয়েক লক্ষ মহিলা ধর্ষিত ও নির্যাতিত হইয়া প্রাণ বিসর্জন দিয়াছেন। তাহাদের সেই সকলের রক্তের বিনিময়ে, সম্ভ্রমের মূল্যে বাংলাদেশ স¦াধীন হইয়াছে। বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানগণ শুধুমাত্র বাঙালি হইবার অপরাধে জীবন বিসর্জন দিতে বাধ্য হইয়াছেন। তিনি নিবেদন করেন যে এই জাতি যদি সেই লক্ষ লক্ষ নারী পুরুষের স্মৃতি রক্ষা করিতে অসমর্থ হয় তাহা হইলে আমাদের মুক্তিযুদ্ধই ব্যর্থ হইবে, আমাদের স¦াধীনতা অর্থহীন হইয়া পড়িবে, আমরা একটি কৃতঘœ জাতিতে পরিণত হইব। সংবিধানের ২৪ অনুচ্ছেদ নিরর্থক বাগড়া¤¦রে পরিণত হইবে।
 
জনাব আব্দুল বাসেত মজুমদার, ড. রাবেয়া ভূইঞা, জনাব এ, এফ, এম, মেজবাহউদ্দিন ও জনাব শ.ম. রেজাউল করিম, এ্যাড্ভোকেটবৃন্দ, দরখাস্তকারী পক্ষের বিজ্ঞ এ্যাড্ভোকেট্ মহোদয়কে সমর্থন করিয়া বক্তব্য উপস্থাপন করেন।
 
 
 

Specifications

  • বইয়ের লেখক: এ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ
  • আই.এস.বি.এন: ৯৮৪৭০২১৪০০৫১৫
  • স্টকের অবস্থা: স্টক আছে
  • ছাড়কৃত মূল্য: ৬৭৫.০০ টাকা
  • বইয়ের মূল্য: ৯০০.০০ টাকা
  • সংস্করণ: প্রথম প্রকাশ
  • পৃষ্ঠা: ১৭৭
  • প্রকাশক: হাক্কানী পাবলিশার্স
  • মুদ্রণ / ছাপা: টেকনো বিডি ইন্টারন্যাশনাল
  • বাঁধাই: Hardback
  • বছর / সন: অক্টোবর, ২০১০

Share this Book

Sky Poker review bettingy.com/sky-poker read at bettingy.com